স্বস্তির জয়ে সমতায় শেষ 1

স্বস্তির জয়ে সমতায় শেষ

জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় ইনিংসের ৭২তম ওভারের খেলা চলছিল তখন। বল করছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। উইকেটে এক রকম থিতু হয়ে ছিলেন ব্রেন্ডন টেলর ও পিটার মুর। মিরপুরের ২২ গজে দুজনই যেন ধ্যানী ঋষি। উইকেটও কেমন যেন নির্বিষ। এ দুই ব্যাটসম্যানের ধ্যান ভাঙাতে একের পর এক অস্ত্র ব্যবহার করছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হওয়ার নয়। এমন সময় গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে ভেসে এল ‘মিরাজ উইকেট! উইকেট মিরাজ’ বলে দর্শকদের রব। আর এটিই যেন কাজে লেগে গেল। কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় মিরাজও হয়তো শুনলেন দর্শকদের সেই চিত্কার। ওই ওভারের পঞ্চম বলে পা বাড়িয়ে ডিফেন্স করতে গিয়েছিলেন মুর। ভুলটি যেন সেখানেই হলো। ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে গেল শর্ট লেগে দাঁড়ানো ইমরুল কায়েসের হাতে। মুরের ধ্যান ভঙ্গ হওয়ার সঙ্গে ভাঙল জিম্বাবুয়ের সব প্রতিরোধও। তারপর কেবল হাতিয়ার সমর্পণ। অনেক পাওয়ার এক ম্যাচে ভয় তাড়িয়ে বাংলাদেশও পেয়ে গেল স্বস্তির এক জয়। যে জয়ে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করল বাংলাদেশ। এ ম্যাচে স্বাগতিকদের জয় ২১৮ রানের বিশাল ব্যবধানে।

ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে গল্পটা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সিলেটে যেতেই সব হিসাবনিকাশ ভোজবাজির মতো বদলে যায়। দুই ইনিংসে ভয়াবহ ব্যাটিং ব্যর্থতায় সিলেটের অভিষেকটাকে হতাশায় ডোবায় বাংলাদেশ। সে ম্যাচের পর নিজেদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কথা বলেছিলেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ। বলেছিলেন ঢাকা টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর কথাও। মুখে যা বলেছিলেন, মাঠের খেলায় তার প্রমাণ দিলেন। এ টেস্টের আগে সর্বশেষ আট ইনিংসে যে দল ২০০ পার করতে পারেনি, সে দলটিই কিনা ঢাকা টেস্টে পেল একটি ডাবল ও দুটি সেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে দ্রুত ৩ উইকেটের পতন হলে মুমিনুল হকের ১৬১ রানের পর মুশফিক করেন ২১৯ রান। বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করে ৭ উইকেটে ৫২২ রানে। জবাবে জিম্বাবুয়ে অলআউট ৩০৪ রানে। এরপর ২১৮ রানে পিছিয়ে থাকা জিম্বাবুয়েকে ফলোঅন না করিয়ে নিজেরাই ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বাগতিকরা। ১০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে আবারো বিপর্যয়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সাড়ে আট বছর পর পাওয়া এক শতকে ৬ উইকেটে ২২৪ রানে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য ৪৪৩ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে পঞ্চম দিনের দুপুর পেরোতেই জিম্বাবুয়ে গুটিয়ে যায় ২২৪ রানে। জয় উৎসবে মাতে বাংলাদেশ।

চতুর্থ দিন শেষে সেশন ধরে খেলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন জিম্বাবুয়ের কোচ লালচাঁদ রাজপুত। সেই সঙ্গে জানান নিজেদের রক্ষণাত্মক কৌশলের কথাও। যেভাবে ভেবেছিলেন, প্রথম সেশনটা পুরোপুরি মনমতো না হলেও একেবারে মন্দ ছিল না জিম্বাবুয়ের জন্য। ৩১ ওভারে ৮৫ রান তুলে তারা হারায় ২ উইকেট। ৭৬ রানে দিন শুরু করা জিম্বাবুয়ে দিনের প্রথম উইকেট হারায় ৯৯ রানে গিয়ে। মুস্তাফিজের বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন শন উইলিয়ামস। এরপর টেলর জুটি গড়েন সিকান্দার রাজার সঙ্গে। গোটা সিরিজে ব্যাট হাতে ব্যর্থ রাজা এবারো বেশি দূর যেতে পারেননি। মাত্র ১২ রান করে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন। এরপর প্রথম ইনিংসের মতো আবারো পিটার মুরকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে যান টেলর। মুর রান তোলার চেয়ে উইকেটে টিকে থাকাকেই যেন পাখির চোখ করেন। ডিফেন্সিভ মুডে বাংলাদেশী বোলারদের আশাহত করতে থাকেন মুর। সঙ্গী টেলর অবশ্য কিছুটা আগ্রাসী ছিলেন। একপর্যায়ে এ দুজন মিলে খেলে ফেলেন প্রায় ২৪ ওভার। তবে লাঞ্চের পর মিরাজের শিকার হয়ে ফিরতে হয় মুরকে। যিনি ১৩ রান করতেই খরচ করেন ৭৯ বল। ভাঙে দুজনের ৬৬ রানের জুটি। মুর ফিরতেই জিম্বাবুয়ে যেন তাসের ঘর। ১৯৯ রানে রান আউটের শিকার হয়ে ফেরেন চাকাভা। ২০১ রানে যেতে নেই ডোনাল্ড তিরিপানোও। এরপর ২২৪ রানে যেতে গুটিয়ে যায় সফরকারীরা। একপ্রান্ত আগলে অপরাজিত থেকে যান টানা দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করা টেলর। তার ব্যাট থেকে আসে ১৬৭ বলে ১০৬ রান।

জিম্বাবুয়ের শেষ তিন ব্যাটসম্যানের প্রত্যেককেই ফিরিয়েছেন মিরাজ। প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট পাওয়া মিরাজ দ্বিতীয় ইনিংসে পেয়েছেন ৫ উইকেট, ২ উইকেট পেয়েছেন তাইজুল। ম্যাচসেরা হয়েছেন ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মুশফিকুর রহিম এবং সিরিজসেরা হয়েছেন দুই টেস্টে ১৮ উইকেট পাওয়া তাইজুল।

Add your comment

Your email address will not be published.